সুরুলের দুগ্গাপুজোয় কি আজও বেঁচে সেই ফিরিঙ্গি সাহেব
সৌমেন জানা
শিক্ষক, মুর্শিদাবাদ
ধন-সম্পত্তি লাভের আশায় ‘লক্ষীর পুজো’ করে থাকেন বাঙালিরা৷
কিন্তু এ তো দুগ্গা পুজো!
তা’ও আবার বাঙালি কারও নয়, এক ফিরিঙ্গি সাহেবের!
শুনে তাজ্জব লাগে বই কী!
চমক ভাঙাতে চলুন পিছিয়ে যাই দুই শতাব্দী পিছনে!
১৭৮৭ সাল।
বীরভূমের সুরুল।
শান্তিনিকেতন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে।
সকাল সকাল প্রজার দল চলেছে এক সাহেবের বাংলোয়৷
তাদের সুখ-দুঃখের আর্জি জানাতে।
এ সাহেব নাকি অন্য ‘লালমুখো’-দের মতো তো নয়!
বরং দয়ালু। দরদী। নাম, জন চিপ।
বছর ক’য় হল তিনি এসেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মাশিয়াল এজেন্ট হয়ে।
তার জায়গায় আগে ছিলেন মিস্টার কিটিং।
তাঁর যা স্বভাব! লোকে সাত হাত দূরে থাকত!
রগচটা। তিরিক্ষি। খেঁকুড়ে। কথায় কথায় অসন্তোষ!
একে রুখা-সুখা জলা-জঙলার দেশ, বাড়িটাও ছিল তাঁর না-পসন্দ, তার ওপর সরকারের নামমাত্র নজরানা, কোনওটাই তাঁর মনমতো না।
ফলে কিটিং সব সময় থাকতেন সপ্তমে!
কিটিং-এর সঙ্গে শুধু স্বভাবে নয়, অন্য অনেক কিছুতেই মাইল-মাইল ফারাক চিপের।
সে কেমন?
বলতে গেলে সেই সময়কার সুরুলের কথা একটু কয়ে নিতে লাগে।
লোহা, লাক্ষা ও নীল শিল্পের জন্য তখন ‘সুনাম’ সুরুলের। ইংরেজ আর ফরাসি কুঠিয়ালরা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে বীরভূম জুড়ে।
চিপ সুরুলে আসেন ১৭৮২-তে। তখন সুরুলের উত্তর-পশ্চিমে দু’টি কুঠি তৈরি হয়। ফরাসিদের পক্ষে মনলি সিনর এবং ইংরেজদের পক্ষে চিপ সাহেব, সেই কুঠির থেকে ব্যবসা পরিচালনা করতে শুরু করেন।
পরে এই মনলির কুঠিটিই অধিগ্রহণ করে বিশ্বভারতী!
কুঠিয়াল কিটিং সাহেবের পরিবর্তে যখন এলেন চিপ, তখন আম আদমির মনে হয়, তাতে আমাদের কী! এক দজ্জাল গেল, তো অন্য এক এল৷
কিন্তু না, কিছুদিন যেতেই বোঝা গেল, এ সাহেব যেন একটু ‘অন্য ধারা’৷ তাঁর কাছে ঘেঁষা যায়। অভাব-অভিযোগ জানানো যায়৷
সমাধানও হয়ে যায় কারও কারও।
পরে পশ্চাতে টের পাওয়া গেল, সাহেব করিৎকর্মাও বটে৷ কোম্পানির খাতাতেও তাঁর নামে সুখ্যাতি৷ দিনে দিনে পদোন্নতি হতে হতে তিনি পৌঁছেছেন বীরভূমের কমার্সিয়াল এজেন্টের পদে৷
স্বভাব গুণে অল্পদিনের মধ্যেই প্রজাদের মন কাড়তে লাগলেন চিপ!
কিটিং যদি দক্ষিণের হন, তো চিপ উত্তরের।
সকলের মন জিততে তাঁর জুড়িটি নেই।
এ কথা কোম্পানির ওপরওয়ালাদেরও নজর এড়ায়নি।
এনিয়ে হান্টার সাহেবে একটা বইয়ের কথা বলি।
W.W. Hunter, বইয়ের নাম ‘দ্য অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল’। সেখানে একটা জবরদস্ত ব্যাখ্যা ফেঁদেছেন তিনি, এই দুই সাহেব কর্তাকে নিয়ে।
তাঁর বাংলা তর্জমাটি করেছেন লেখক-রাজনীতিক অসীম চট্টোপাধ্যায়।
সেটি একবার তুলে ধরা যাক, তা’হলে চিপ-চরিত্রের ‘মোলায়েম’ চিত্রটি খানিকটা খোলসা হবে। —
‘‘তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুদের নিকট মিঃ কিটিং ছিলেন কোম্পানির শিবরূপ প্রতিমূর্তি— ক্ষতিসাধনের ক্ষমতা সম্পন্ন দেবতা ও সেই কারণেই তুষ্ট রাখা বিধেয়, আর মিঃ চিপের মাধ্যমে কোম্পানি বিষ্ণুরূপে অবতীর্ণ, মঙ্গলার্থে প্রবল, কম ভয়ংকর তাই কম ভক্তিভাজন, কিন্তু শ্রদ্ধার-ভালবাসার পাত্র, সর্বদিক দিয়ে মিষ্ট কথায় তুষ্ট করার ও প্রতারিত করার দেবতা।’’
ফিরে যাই সে দিনের কথায়।
যত দিন গড়ায়, সাহেবের প্রশংসা লোকের মুখে মুখে৷
কোম্পানির কানে যেত সব।
হিঁদুরা তাঁকে যে ‘ভগবান’ মানে, তা’ও। এ নিয়েও মস্ত বর্ণনা আছে হান্টারের—
‘‘কারখানা থেকে কারখানা তাঁকে অনুসরণ করত বিনি মাইনের দীর্ঘ বাহিনী এবং গ্রামগুলির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর পালকির দর্শনলাভের জন্য মায়েরা শিশুদের তুলে ধরত, আর বৃদ্ধরা অন্নদায়ী দেবতার সম্মুখে আভূমি আনত হত। যে শিশুর উপর তাঁর ছায়াপাত ঘটত, সে মহা ভাগ্যবান!’’
অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে জেলার জাস্টিস জেনারেল করে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হল!
ততদিনে মুখে মুখে চিপ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ‘চিক’৷
বহু পরে সাহিত্যিক শ্রীপান্থ-র লেখা ‘কলকাতা’ গ্রন্থেও পাই এই চিপসাহেবের কথা! তিনি লিখছেন, লোকে সম্মান দিয়ে সাহেবকে ডাকত, ‘শ্রীযুক্ত চিকবাহাদুর’!
সাহেবের নাম ‘চিপস’ বলেও উল্লেখ আছে কোথাও কোথাও।
তবে হান্টার তাঁকে ‘মিঃ চিপ’ বলেই উল্লেখ করেছেন৷
সে যাক্ গে!
মোদ্দা কথা সাহেব ছিলেন জনপ্রিয়। বিলাসীও।
সুরুলে তিনি তৈরি করলেন তাঁর প্রাসাদ৷ নিজে ব্যবসাও ফেঁদে বসলেন৷
কিন্তু কোম্পানির কাজে যেমনটি সাফল্য পাচ্ছিলেন, নিজের ব্যবসায় তেমনটা নয়৷
তাতে চিন্তায় পড়লেন সাহেব। তাঁর সেই চিন্তার কথা শুনে এক শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন মা দুগ্গার পুজো করেন।
চিপ জানতেন, তিনি দুর্গাপুজো করলেও কোম্পানি নারাজ হবে না৷ এদিকে মা ‘সন্তুষ্ট’ হয়ে তাঁর ব্যবসাটা যদি জমিয়ে দেন, তাহলে তো অতি উত্তম৷
অতএব শুরু হল চিপ সাহেবের দুর্গাপুজো৷
তবে হ্যাঁ, জাঁকজমকে তা তখনকার বাবুদের বাড়ির পুজোর ধারেকাছে নয়।
বরং বেশ মিয়োনো।
আসলে ‘জাঁক’ দেখানো তো সাহেবের কম্ম নয়। তাঁর লক্ষ্য অন্য। দু’পয়সা খরচা করে পুজোর ক’দিন গাঁয়ের লোকদের ভরপেট খাওয়াতেন তিনি৷ তাতে বরং তাঁর ষোলো আনা লক্ষ্যের অনেকটাই উশুল হত!
লোকে বলে, চিপ সাহেবকে মা ‘আশীর্বাদ’ দিয়েছিলেন এরপরই৷ তাঁর ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠল। সুরুলের সরকার বাড়ির শ্রীনিবাস সরকার, তাঁর সঙ্গে কারবার করে সম্পদশালী হয়েছিলেন৷
সে পরিবার এখনও বিদ্যমান। খ্যাতনামা তো বটেই।
শোনা যায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের জমি অনেকটাই কিনেছিলেন এই পরিবারের কাছ থেকে।
সে অবশ্য অন্য গল্প।
১৮৩৫ সালে কোম্পানি এখানে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দিলে, চিপের ‘রেসিডেন্সি’টি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এখন আর তার কোনও চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।
নেই সেই ফিরিঙ্গি সাহেবের পুজোও।
তবে সুরুলবাসী দুগ্গা পুজো আজও করে চলেছেন। এবং তাতে জাঁকের বালাই নেই। দেখনদারি নেই। বাহুল্য নেই কোনওখানে। এই ঢঙেই কি আজও বেঁচে আছেন চিপ সাহেব?! সুরুলবাসীর জীবনে?
সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে?!
সোনার ফসলে ভরা সুরুল |
সুরুল যাওয়ার পথে |
আমাদের ব্লগে প্রকাশিত আরও লেখা
No comments:
Post a Comment